Category: Fiction

আমার কথা (প্রভু সন্নিবেশ)

অংক ১

 

তখন আমি শিশু- ভাঙ্গনের আওয়াজ শুনি প্রথম

কোন এক বিস্তীর্ণ ভূকম্পে দেখি পৃথিবী টলায়মান

প্রচন্ড এক আতংকে আমি ডুকরে কাঁদি

বলে উঠি- মরণ ভালো এর চেয়ে।

আমার সেই কান্নাভেজা আকুতি শোনেন আমার প্রভু

ভেঙ্গে যাওয়া কাঁচের পৃথিবী এক করে দেন তিনি…

সেই ফাটল আমি দেখে গেছি চিরদিন

আমার নিভৃতে কেঁদেছি রাতের পর রাত,

টুকরো পৃথিবী আঁকড়ে রাখতে দেখেছি প্রভুর রক্তাক্ত হাত,

আমার কান্নায় মিশে গেছে তাঁর হাহাকার-

তবু তাঁর মুখ দেখেছি আমি কষ্টের অনুভুতিহীন

দেখেছি ভুবনভোলানো হাসিতে পৃথিবীতে আলোর ফোয়ারা।

তারপর ভুলের পর ভুল করে কাঁদিয়েছি তাঁকেই

জানি আমার পৃথিবী অস্থির হবে না তিনি থাকতে

এক অপার নির্ভরতায় তাঁকেই অবহেলা করেছি

ভুলে গেছি প্রভুও ব্যাথিত হন আমার ঔদাসীন্যে।

কোন এক বিষন্ন সন্ধ্যায় দেখেছি তাঁর নিভৃত ক্রন্দন

ভেবেছ, একি করলাম! এর চেয়ে প্রস্থান ভালো।

 

 

অংক-২

 

কতকপর-

আমি আকাশ দেখি বিবর্ণ, সেখানে বিরহের সানাই বাজে

লজ্জিত আমি সংকীর্ণতার খোলসে জড়িয়ে কুঁকড়ে থাকি

প্রখর রোদ আর সবুজহীন প্রান্তরের এক কোণে-

আচমকা রক্তাক্ত প্লাবনের ঢল নামে পৃথিবীর বুকজোড়া

ভাসিয়ে যায় আমার প্রভুর চরণে

কম্পমান আমি অপেক্ষা করি তাঁর মৌনব্রত ভাঙ্গার

আমায় দেখে তিনি হুংকার করে ওঠেন

ভীত-অভিমানী আবার উঠি

এবার শাসন করেন তিনি- প্রভুর অধিকারে নত হই আমি।

প্রভু আমায় ঠাই দেন তাঁর অসীম অন্তরীক্ষে-

তাকিয়ে দেখি রক্তের প্লাবন বাহিরে নেই আর

এর উৎস যে এখনেই!

আজ ভাবি, কি হত যদি আমি স্রোতের টানে না ভেসে উজানে যেতাম?

কি হত যদি নির্লজ্জ অহংকার ভাঙ্গার অভিমানে আমি রয়ে যেতাম আড়ালেই?

হয়তো কিছুই না- একেবারেই কিছু না…

হলদে পাতার গল্প

হে সমুদ্র,
তোমায় আজ একটা গল্প শোনাবো বলে এসেছি।

দেখো তোমার বহমান খরস্রোত,
ঊর্মির সাথে বয়ে যায়, ভেসে যায়, দৌড়ে যায়
ঐ বারিমালা-
এটা তাদের গল্প নয়।

দেখো ভাসমান জাহাজের দূর্বার গতি
ঢেউয়ের বুক চিরে যায়তীরের দিকে-
স্রোতের পক্ষে বা বিপক্ষে,
এটা তাদেরও গল্প নয়।

দেখো ঐ মৎসপাল
ঝাঁকে ঝাঁকে ঘুরে বেড়ায়একুল হতে ওকুলে
তাদের বাসভূমি যে এখানেই-
এটা তাদের গল্পও নয়।

গল্পটা ভাসমান ভিনদেশী এক পত্রপল্লবের
সেই যে ঝড়ো হাওয়ায় ছিড়ে নিয়ে এলো
শুকিয়ে হলদে হয়ে গেলো,
ছেড়ে এলো তার পূণ্যভূমি- এক দমকায়
তার গল্প এটা।

সবুজ স্নিগ্ধ প্রবাল বা সামুদ্রিক গাছ নয়,
কচুরীপনা আর শেওলা নয়-
কোন জলজ উদ্ভিদ অথবা ফুলও নয়,
স্রোতের ধাক্কায় মুহুর্মুহু এমাথা ওমাথা
পরদেশী যে হলুদ পাতাটা উদ্দেশ্যহীন ভাসে
পচে তলিয়ে যাবে বলে-
গল্পটা তার।

শুনবে কি? দু’ফোটা অশ্রুবলি কি দেবে?
অথবা মৌনতায় করবে কি শোকপ্রকাশ?
তার নামে দেবে তোমার কোন তীরের নাম?
অথবা একদিন ছুটি?

বড় বেশি ব্যস্ত তোমরা,
চালচুলোহীন পাতার গল্পে পোষাবে কেন বলো?
আমি কিন্তু বলেই যাবো-
স্রোতের ধাক্কায় এমাথা ওমাথা
অন্তহীন বয়ে যাওয়া তলানোর আগে,
একটা- দু’টো- হাজারো হলদে পাতা-
গল্পটা তার, তাদের।

— হলদে পাতার গল্প

বিদায়ী পথিক

 

 

 

পথিক আমি- গন্তব্যহীন গন্তব্যে হেটে যাই

আর এই অবেলায় কিছু শ্বাশত বলে যাই,

এই চাঁদের আঙিনায়, আমি হেটেছি প্রান্তরে প্রান্তর

কতরূপ দেখেছি- আপন দেখেছি দেখেছি পর,

দেখেছি গোধুলী, মধ্য আকাশে পিচগলানো ঝাঁঝ

চাদর ফেলে ওঠা অলস সকাল আর বাঁদুরে সাঁঝ,

আমি চলেছি, বসেছি, হেসেছি- কেঁদেছি

কবিতা বুনেছি, গলা ছেড়ে কখনো গেয়েছি,

নেয়েছি নোনা আর মিঠা জলে

শুনেছি সমাজ আর লোকে কি বলে,

শত-সহস্র বছরের পুঞ্জীভূত কষ্ট আর আক্রোশ পড়েছি

যত ধোঁকা আর নষ্টের ইতিহাস ও পড়েছি,

গিয়েছি লোকালয়ের নির্জনতা আর মৌনতার মেলায়

ওদের গল্পগুলো বেধেছি সাদাকালো আর রঙ্গিনের ফিতায়,

আজ কানে বলি শোন-

শত শত পথিক দেখো গাথা মহাকালের সুতায়

ওরা মৌন চিৎকার করে ওঠে হাজার গলায়,

 

আহাঃ সবাই যে অর্থহীন আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে আছে!

কালের পরতে পরতে শোন তিমিরের হাহাকার জড়িয়ে আছে,

ওদের ঝেড়ে ফেলা ধুলোতে দেখো ক্লান্তির ছাপ

বুকজোড়া দেখ দগ্ধদাহ আর কতনা প্রত্যাশার চাপ,

দমকা হাওয়ায় প্রদীপ আচমকা নিভল যখন

কুহকী স্বপ্নের ভোর কাটলো তখন,

সায়াহ্ন নিকটে আজ বলি- মায়া না হেরিও

এর পিছনে যে চিরসুপ্ত কায়া, তাঁকে খুঁজিও।।

 

 

 

 

পথিক

 

হে পথিক, যাচ্ছ কোথায়- একটু দাঁড়াও

বসো একটু এই ছায়াতলে, বিশ্রাম নাও খানিকটা

জুড়াও হৃদয়খানি শীতল শাসে আর জলের ছোঁয়ায়

দেখো ঐ আকাশে মেলছে ডানা নীল মেঘমালা

ভরো শ্বাস এই মুক্ত নির্মল বাতাসে-

খাবে কিছু? এনে দেবো সদ্যফোটা কবুতরখানির ভুনা-

নাকি ঘুমোবে- দেবো বিছিয়ে কচি শিমুলের বালিশখানি?

কি হলো?

 

যার বিরহে এ প্রাণের উচাটন- পারবে এনে দিতে?

কত রাত কত শ্বাস ধরে ছটফট করছি

মনের কোণে যে বহ্নির ফোয়ারা তাঁর বিহনে

পারবে বুজাতে তাকে? যদি না পারো তবে ছেড়ে দাও আমায়…

তাঁকে ঘিরেই যে সব আমার- মৌনতাই সরব তাঁর সাথে

পথচলাই যে বিশ্রাম, অনাহারই যে খাবার

তৃষনাই যে আমার পান করা… তাঁকে পেলেই যে নাববে

আঁধার এ লন্ঠনখানিজুড়ে।