Month: May 2014

প্রেম-সম্পর্ক, বাস্তবতা-কল্পনা

অনেকদিন ধরেই জমছে কথাগুলো। আগেও বলেছি আমি নির্বাক টাইপের মানুষ। একেবারে জমে বস্তাপচা না হয়ে গেলে সাধারণতঃ মুখ খুলি না। আমাদের সমাজটা যে মেকিতে ভরে যাচ্ছে, তা আর না বলে পারছি না। লেখক-সাহিত্যিক আর গায়কেরা আগে আমাদের ভালোবাসার তীব্রতা বুঝিয়েছেন রোমান্টিকতায় এবং গভীর থেকে আরো গভীরে যেতে বলেছেন এ খেলার। এরপর আসলো রঙিন পর্দার যুগ। এখনতো এটার সংজ্ঞা ক্রমশঃ আত্মিক থেকে শারিরীক এবং বর্তমানে কালক্ষেপনের বস্তুমাত্রে দাঁড়িয়েছে। ভালবাসাকে রোমান্টিক করতে করতে এখন তারা এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, যেখানে বিনোদন ই হচ্ছে সম্পর্কের মূলবস্তু। যতক্ষন বিনোদন দিতে পারো, উচিত-অনুচিত বাদ দিয়ে কেবল ভালোবাসার পূজা করতে পারো- তবেই তুমি প্রেমিক। বস্তুতঃ ভালোবাসার পর্যায়ে এটা আর নেই- ঐশ্বরিক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন তারা।

আমরা ম্যাঙ্গো পিপল। আমাদের মধ্যে দোষ-ত্রুটি আছে। থাকবেই। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটাকে আমরা কমাতে চেষ্টা করবো- এটাই মনুষ্যত্বের দাবী। আমরা আমাদের ভুল শোধরাবো, ভালো মানুষ হবার চেষ্টা করবো- সেটা চাওয়াটা বিবেকের পরিপন্থী কি? হালের বাতাসে চলে, ‘আমি যেরকম আমাকে সেভাবেই মেনে নাও। আমাকে বদলিও না।‘ পরিস্থিতি মেনে নিয়ে আমাদের চলতে হয় মানি। কিন্তু মনুষ্যত্বের আঙ্গিকে আমাদের এতটুকু বোধ ত থাকা উচিত যে কেউ কোন কথা বললে তা অন্ততঃ শুনব, বোঝার চেষ্টা করবো এবং যদি বেঠিক হয় তখন হয়তো এর বিপক্ষে দাঁড়াবো। কিন্তু কোন কথা বলাই যাবে না কেননা তুমি আমাকে বদলানোর চেষ্টা করছো, আমার আমিত্বে আঘাত হানছো- এটা কেমন কথা? তাহলে আমাদের সবচে’ বড় শত্রু আমাদের বাবা-মা, ভাই-বোন আর শিক্ষকরা হবেন।  

আমাদের আমিত্বে সবচে’ বড় আঘাতদানকারী সত্ত্বা হচ্ছেন আমাদের মা। আমাদের খাওয়া-ঘুম থেকে কাপড় পড়া, লেখা-পড়া করছি কিনা, খেলা-ধূলা বেশি করলাম কেন- সবকিছুতে মায়ের বাড়াবাড়ি। কিন্তু এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে- কেউ যদি আমাদের সবচে’ বেশি ভালোবেসে থাকেন, তিনি মা নন? সব মায়ের সব চাওয়া ঠিক না, সব শেখানোও না- কিন্তু তাদের ভালবাসায় খাদ নেই। যদি ভুল করেও থাকেন, তা ভুল করেই- জানেন না বা বোঝেন না বলেই। জ্ঞানতঃ কোন মা তার সন্তানকে ভুল শেখান না, কষ্ট দেন না। আর যদি কেউ দিয়ে থাকে তবে সে মা সুস্থ নন- অসুস্থ বলেই এ রকম করতে পারেন। যা হোক, সেই মা যখন আমাদের কোন আদলে গড়েন, তা আমাদের ভালোর জন্যই। এক্ষেত্রে কেউ প্রশ্ন করবে না। কিন্তু ভালোবাসা নামক যে বস্তুটার আজকে চল, সেখানে কারো ভুল ধরানো যায় না- ভালো কোন পরামর্শ দেয়া যায় না- কোন কিছু আলোচনা পর্যন্ত করা যায় না। কেন? যদি আমাকে ভালোবেসেই থাকো- আমাকে আমার ভুলসহ গ্রহণ কর।‘ ওকে মেনে নিলাম। কিন্তু কিছু জিনিষ এমন থাকে যা উক্ত মানুষের নিজের জন্য ক্ষতিকর। উদাহরণঃ ধূমপান। এখন যদি প্রেমিকা বলে তুমি এটা ছাড়ো। সেটা কি খারাপ? নাহ, বরঞ্চ সবাই বোঝে যে মেয়েটা কেয়ারিং। হয়তো একটু বেশি নীতিবাগীশ- কিন্তু সততা মেনে চলতে বলছে যে, সে কি খারাপ? আমাদের মন যা চায়, তার বাইরে কেউ কিছু বললে আমরা আজকাল ফেলনা করে রাখি। ধূমপান হতে শুরু করে ন্যায়-নীতির অভাবে আমাদের সমাজ বা পরিবার কি মুক্তির দিকে যাচ্ছে না ধ্বংসের দিকে?

একটা সময় ছিল যখন স্বামী স্ত্রীকে না দিয়ে খেত না, স্ত্রী’র সাথে অন্যায়-অবিচার করত না, টর্চার করত না। আমি আমার বাবাকে দেখেছি সুস্থ অবস্থায় কখনো মাকে না নিয়ে খেতে বসতেন না। আমার নানাকে দেখেছি কেউ কিছু দিলে সেটা ঘরে এনে স্ত্রী’র সাথে আধাআধি করে খেতেন। মাকে দেখেছি শত ভুল সত্ত্বেও বাবাকে আগলে রেখেছেন। নানীকে দেখেছি নানাকে ছাড়া কোথাও যেতেন না। আমার নানা প্রায় শতবর্ষী ছিলেন। ওই বয়সে তিনি তার সন্তানদের চিনতে পারতেন না- তাদের পরিচয় দিতে হত। তিনি শুধুমাত্র নানীকে চিনতেন। আর ছেলেমেয়েদের চিনতে না পারায় নানী তাঁকে মৃদু বকাও দিতেন। আমার নানা নামায পড়েছেন কিনা, খেয়েছেন কিনা- কিছুই বুঝতেন না নিজে। ক্রমাগত নামায পড়তে থাকতেন বা খেয়ে উঠেও খেতে চাইতেন। তার বোধশক্তি ছিল না সেরকম। কিন্তু নানী যখন বললেন আপনি কত পড়েন নামায? বা এই না খেলেন? নানা বুঝতেন- তার খাওয়া হয়ে গিয়েছে বা নামায পড়া হয়ে গিয়েছে। নানী বলেছেন এর উপর আর কথা নেই। আর নানী কেমন ছিলেন? নানার মারা যাবার চল্লিশ দিন পর তাঁর চল্লিশা পর্যন্ত সুস্থ। চল্লিশা শেষ হবার পরপরই নানী কোমায় চলে গেলেন। সেখান থেকেই মৃত্যু। একটু তাদের পরিচয় দিই। আমার নানী ছিলেন জমিদারের মেয়ে আর নানা মৌলভী। দ্বীনদার আর সততা দেখে নানার কাছে মেয়ে দেন নানীর বাবা। আমার নানার ঘরে প্রাচূর্য ছিল না। নানী ঘরের কাজ একলাই করতেন। নানার স্বল্প আয়েই আমার মায়েরা পাঁচ ভাই-বোন মানুষ। নানা ছিলেন শিক্ষক। এই ঘরে পঞ্চাশেরও বেশি সময় ধরে তারা সংসার করেছেন। এবং তাদের জীবনের সায়াহ্ন আমি একটু আগেই বললাম। দেবদাস-পারু, ভীর-জারা আর রোমিও-জুলিয়েটের মত প্রেম তারা করেন নি। তাদের প্রেম ভর্তি রোমান্টিক বাক্যালাপ ছিল না। ছিল সততা-নিষ্ঠা-সম্মান আর ত্যাগ। একে অপরের ভালো করেছেন, ভালো চেয়েছেন- একে অপরের কথা শুনেছেন। নানা নানীকে শাসন ও করেছেন কখনো কখনো। নানী এ জন্য দুনিয়া-আসমান এক করে ফেলেন নি। বরং কথা যৌক্তিক হলে শুনেছেন। নানী যখন নানাকে বকেছেন সেখানে নানা শুনেছেন। কারণ, একে অপরের ভালোবাসা নিয়ে তাদের মনে কোন সন্দেহ ছিল না। তাদের মনে হয়নি, ও আমাকে আমার ত্রুটি দেখিয়ে ছোট করছে। বরঞ্চ মেনে নিয়েছে ভালোবাসে তাই তো বলেছে, খারাপ চেয়ে তো আর বলে নি। আর আমাদের কোন স্বামী স্ত্রীকে কিছু বললে বা স্ত্রী স্বামীকে কিছু বললে তেলে বেগুনে লেগে যায়। এর কারণ, বিশ্বাসের অভাব আছে মূলে। স্ত্রী যদি জানত স্বামী ভালো চেয়ে কিছু বলেছেন- তাহলে মেনে নিত। এই নূন্যতম বিশ্বাসটুকুই তো নাই। আর দ্বিতীয়তঃ মানার যোগ্যতা নাই। কারো কথা শুনতেই ইচ্ছা করে না। রোগের ওষুধ নেয়া তো পরের কথা- মানুষ রোগের অস্তিত্ব অস্বীকার করে বসে আছে। যেন এতে করে ক্ষতি কম হবে! এটা আর যাই হোক সুফল বইবে না।

আমাদের কাছে আজকাল সবচে’ ভালো সম্পর্ক হলো বন্ধু-বান্ধবী বা প্রেমিক-প্রেমিকা। দুটোর মূল কাজই হচ্ছে বিনোদন। সবাই মিলে ই মজা করি আমরা। আবেগিক সাহচর্যের মাঝেও ক’জন আছে বন্ধুর ভুলটা শুধরে দেয় যাতে সে ভবিষ্যতে না ভোগে? বরঞ্চ কেউ নীতিকথা বললে আমরা তাদের গ্রুপ থেকে সরিয়ে দিই আর না সরালেও তার কথা অগ্রাহ্য করে রাখি। তাকে নিয়ে হাসাহাসি করি বা পুরো খেলোভাবেই নিই সে যা বলে। আমি বিনোদনের বিপক্ষে নই। কিন্তু শুধুমাত্র বিনোদনভিত্তিক সম্পর্কের বিপক্ষে। প্রত্যেকটা সম্পর্কের কিছু দাবী আছে-চাওয়া আছে-প্রত্যাশা আছে, এটা সবাই মানে। কিন্তু এর বাইরেও প্রত্যেকটা সম্পর্কের আরো কিছু দায়িত্ব এবং কর্তব্য থাকে। এখানেই সবার সমস্যা- কেউ শুনতে রাজি না কোন উচিত-অনুচিতের কথা। আমরা যখন অভাবে থাকি, অভাব কাটানর চেষ্টা করি কি না? এটা নিয়ে আলোচনা করি কিনা? এগুলো যদি সম্পর্কের ক্ষতি না করে তবে মন্যুষত্বের আলোচনায় বাঁধা আসে কেন? আসল কারণ তো হচ্ছে এটা- আমরা নিজেদের যথেষ্ট ভালো মনে করি এবং কেউ কিছু বলতে যাওয়ার আগেই লেগে যাই কেননা এতে আমাদের আঁতে ঘা লাগে।

নিজেদের ক্ষেত্রে আমরা যতটা উদাসীন, অন্যের ব্যাপারে ঠিক ততটাই কড়া। বাবা-মা যদি তাঁদের দায়িত্বে অবহেলা করে থাকেন তাঁদের দুষতে আমাদের বাজে না। কিন্তু নিজেরা কতটুকু কি করেছি? আমরা সবাই যার যার দায়িত্বে অবহেলা করি দেখেই স্বামী আদর্শ নয়, স্ত্রী আদর্শ নয়, না বাবা-মা আদর্শ। সবাই যদি সাময়িক আনন্দের মোহ কাটিয়ে নিজের দায়িত্ব পুরা করি তাহলেই সব ঠিক হয়ে যায়। সম্পর্ক তখন আর খেলো হয় না। বাস্তব বাদ বিয়ে কল্পলোকের মোহে গড়া মিথ্যে দুনিয়া গড়ে বসে আছি সবাই। আর সবচে’ বড় দুঃখতো এটা, আমরা এটা মেনে নিয়েছি এবং কেউ এটার বিরুদ্ধে কিছু বললে তাদের চুপ করিয়ে দিই বাক-স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে। আল্লাহ আমাকে সহ সবাইকে বোধ দিন। অলীক ফেলে বাস্তব গ্রহন করার শক্তি দিন।