কোটা বিভ্রাট

কোটা নিয়ে আফসোস আর গালাগালি নতুন নয়। যখন সরকার কোটাসিস্টেম চালু করেন তখন সংরক্ষিত আসনের ঐ শ্রেণীর লোক ব্যতীত অন্যরা এটার দিকে বাঁকাভাবে তাকায়। মানুষ হিসেবে আমরা এখনো অতটুকু উচ্চতায় যেতে পারিনি যেখানে অন্যের ভালো দেখে আমরা গর্ব বা আহ্লাদিত অনুভব করব। মুক্তিযোদ্ধারা যারা যুদ্ধ করেছেন বা তাদের সন্তানেরা- আমার জানামতে তারা কোটার জন্য আন্দোলন করেন নি বা প্রতিবাদসভা করেন নি তাদের প্রায়োরিটি দেবার জন্য। এটা স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারগুলোর পক্ষ থেকে অনারারি বা সম্মানসূচকভাবে রক্ষিত কোটা। যা হোক, এটা কখোনই অযোগ্যকে প্রশ্রয় দেয়া নয়। শুধুমাত্র শর্টলিস্টেড হলে পরেই এর জন্য আপিল করা যায়। একেবারে অযোগ্যদের এটা দেয়া হয় না। এটা অবহেলিত সম্প্রদায়কে সহায়তাস্বরূপ বা অনারারিভাবে দেয়া হয়। বিসিএসের ব্যাপারটাও অনেকটা একই রকম।

ঢাকা ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষার সময় আমার মনে আছে ওখানে কোটার অপশন ছিল। আমার ভাইয়া আমাকে বলেওছিলো- তুই যদি শর্টলিস্টেড ও হতে পারিস, তবে বাবার মুক্তিযোদ্ধা কোটার জন্য আবেদন করবো। বলাবাহুল্য, ঢাকা ভার্সিটিতে শুধু মুক্তিযোদ্ধা কোটা না, উপজাতি কোটাও বিদ্যমান। যাহোক আমরা কখনোই এটাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার পক্ষপাতি ছিলাম না। আমার ভাই তার মেধায়ই যতদূর যাবার গিয়েছেন। আল্লাহ’র রহমতে আমারও কোটার প্রয়োজন পড়ে নি। কিন্তু শর্টলিস্টেড আমার এক বন্ধু যার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন- সে আপিল করে ভর্তি হয়। আমি শিওর যারা আজকে কোটার তীব্র প্রতিবাদ করছেন, কোন কোটার অপশন থাকলে তারাও নির্দ্বিধায় আপিল করে ভর্তি হতেন। শুধুমাত্র কোটা না, আপিল করেও যদি চান্স পাওয়া যায়- সেটা সবাই করবেন। ব্যাপারটা আয়রনিক! কোটার ক্ষেত্রে তাদেরকে দূষে কি লাভ? আপনাদের আপামর জনগণের যদি এতই সমস্যা কোটা নিয়ে, এত বঞ্চনা আর সইতে পারছেন না- তবে আমার আর্নেস্ট রিকোয়েস্ট আপনারা সরকারের কাছে আপিল করেন যেনো কোটা উঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু হিংসা বা বিদ্বেষ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা বা তাদের সন্তানকে গালি দিয়েন না। উনারা কোটা কোটা বলে চিল্লান নাই বা এর জন্য কাঁদুনিও গান নাই।

এক্ষেত্রে আমি আমার এক সহপাঠী ছোট ভাইয়ের উক্তির সাথে প্রায় একমত। তার উক্তি মোটামুটি এরকমঃ

”শোনেন মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানেরা, আপনার বাবা যুদ্ধের সময়ে ঝাঁপাইয়া পরছে দেশের তাগিদে, আমাদের সবটুকু সম্মান, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আপনার বাবার প্রতি। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে আপনার বাবা যেন কখনই অসম্মানিত না হন, চিকিৎসার অভাবে কষ্ট না পান, খাবার কষ্টে যেন তাকে এবং তাঁর পরিবারকে ভুগতে না হয়, তাঁর পরিবারের সদস্যরা যেন অর্থাভাবে স্কুল কলেজে পড়তে পারে না এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয় এসব বিষয়গুলো নিশ্চিত করা, রাষ্ট্রের পাশাপাশি আমাদেরও দায়িত্ব থাকে যেন আমাদের আশাপাশে কোন মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁর পরিবারকে অর্থাভাবে মানবেতর জীবন যাপন না করতে হয় তা নিশ্চিত করা। সরকার এই সব বিষয় নিশ্চিত না কইরা বইয়া রইল কোটা লইয়া। আর রাজাকারদের বিচার নিয়া না হয় কিছু কইলামই না…

যে কোন বিষয়ে অতিরিক্ত সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তির অধিকার একমাত্র আপনার বাবার হওয়া উচিত, আপনার না । আপনি যেন ঠিকভাবে পড়াশুনা করতে পারেন তা যেন কখনো টাকার অভাবে থেমে না থাকে এ বিষয় নিশ্চিত করা সরকার তথা আমাদের অবশ্য কর্তব্য কিন্তু আপনি যোগ্য না হয়েও কোটার জোরে যোগ্য স্থানে আপনার টিকে যাওয়াটাকে আমি যৌক্তিক মনে করি না।

আপনার বাবা এই বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান আমি চিৎকার করে বলি কিন্তু আপনিও শ্রেষ্ঠ সন্তান কিনা তা বলতে পারি না। মেধার পরিচয়ে আপনি আপনার বাবাকে গর্বিত করে তুলুন, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হওন, কোটার করুণায় কেন তা হবে?” কার্টেসিঃ রিয়াদ আরেফিন।

শেষ করার আগে বলতে চাই, সরকার জনগণের মতামত নিয়ে কোটা রাখুন বা উঠিয়ে দিন কোনটাতেই আমার আপত্তি নেই। তবে যাই ঘটুক, এটার জন্য মুক্তি্যোদ্ধা বা তার পরিবারকে গালি দেয়া আমার কাছে অসমিচীন মনে হয়। আর নিজের ক্ষেত্রে আমি একটা জিনিষ সবসময় ভেবে এসেছি বা ভাবি এখনো, সেটা হচ্ছে যতটুকু আমার যোগ্যতায় বা চেষ্টায় পৌঁছুতে পারব- যাব। আমার বাবা কি পাবেন বা পাবেন না ভেবে যুদ্ধ করেন নি। আর আমরা লোয়ার মিডলক্লাস আপামর জনগণ। আত্মসম্মানটুকু ছাড়া তেমন কোন বিত্ত-বৈভব আমাদের নেই। ওটুকুতে হাত দিয়েন না প্লিজ। কোটা রাখুন বা উঠিয়ে দিন- আপত্তি নাই।

অতএব, আমরা ভিক্ষা চাই না- কিন্তু আল্লাহ’র ওয়াস্তে কুত্তা সামলান।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s