বোবার বয়ান

বোবাশ্রেণীর প্রাণী বলে প্রায়-ই আমাকে কথা শুনতে হয়েছে জীবনে। আমি বড় চাপা প্রকৃতির। অনুভূতির প্রকাশ আমার কাছে বেশ স্থুল মনে হয়। আমি এ রকমই। যখন অনুভূতির আক্রোশে টিকে থাকা মুশকিল হয় তখন হয়তোবা কাগজের বুকে দুটো টান দিয়ে তাদের মুক্তি দিয়ে দিলাম। আমি আমার অনুভূতিগুলোকে প্রচন্ড রকম ভালোবাসি আর আঁকড়ে থাকি। তাই ওদের ব্যাকুলতা আমার লেখায় আনতে চাই না। নিজের ভেতর রাখাটাই আমার পছন্দ। আমি লেখক বা কবি নই। অতি সাধারণ এক আম মানুষ। যা লেখি আমার ভালোলাগা-মন্দলাগা থেকে। আমার অনুভূতির পংক্তি নিয়ে যাচাই-বাছাই করে মূল্য নির্ধারণ আমার অপছন্দ। আর আমার অনুভূতি থেকে জন্ম নেয়া প্রত্যেকটা শব্দ মানুষ যখন নিজের নিজের মত করে বিশ্লেষণ করে নিজেদের মনগড়া অর্থ দাঁড় করিয়ে নেবে তার দায়ভার আমার নয়। আসলে মানুষের কাছে আমার প্রত্যাশাটা বড় বেশী বলেই হয়তো তাদের অনিহা আর উদাসীনতাটা বড় বাজে। তাই পারতপক্ষে আমি মুখ খুলি না। তারপরও যখন লিখতে বসি- এর মানে আমি আর চুপ করে থাকাটা সমিচীন মনে করছি না বা চুপ করে থাকতে পারছি না।

মূল প্রসঙ্গে আসি। শাহবাগ নিয়ে এ ক’দিন বেশ হুলস্থূল হলো- হচ্ছে। আমি শুনেছি, দেখেছি কিন্তু নিজ থেকে কখনো কিছু বলিনি। আজ বলবো বলে এসেছি।

সমস্ত কিছুর সূত্রপাত একটি দাবী থেকেঃ যুদ্ধাপরাধীদের চূড়ান্ত বিচার বা ফাঁসী। কাদের মোল্লাকে by name উল্লেখ করা হলেও জনগণ আসলে সমস্ত রাজাকার এবং যুদ্ধাপরাধিদের বিচার ই চায়। সরকার এ পর্যন্ত এ ব্যাপারে একেবারেই জনগণের প্রত্যাশামাফিক কোন পদক্ষেপ ই নেয় নি। আবার সরকার বিরোধিতা ও করছে না। সরকার বা সমাজবিরোধী আন্দোলন হলে তারা চুপ করে থাকতো না এটা নিশ্চিত। তার মানে এটা তাদের স্বার্থবিরোধী নয়। আচ্ছা, এবারে প্রশ্ন হলো তাহলে সরকার চুপ কেন? কেমন যেন একটা খটকা! আমার কাছে সরকারকে আমার মতই নীরব দর্শক মনে হয়েছে। অথচ, জনগণের ন্যায্য দাবিতে সরকারের সায় দিয়ে এগিয়ে আসার কথা। এই সরকার স্বাধিনতার স্বপক্ষের শক্তি। তাদের এই মৌনতাটা আমি মেনে নিতে পারছি না। যারা যুদ্ধাপরাধী তারা দেশের স্বাধীনতার বিপক্ষের। তাদের অত্যাচার আর নিপীড়নের শাস্তি তাদের পেতেই হবে। এটা সরকারের হাতে। তারা চাইলে এটা ব্যাপার না। যারা প্রত্যক্ষ আন্দোলনের সাথে জড়িত আমি আপনাদের কাছে কিছু আবেদন নিয়ে এসেছি-

1. দেশপ্রেম নিয়ে এগিয়ে আসুন। ব্যক্তিকেন্দ্রিক রোষের অনলে বা পার্টি স্বার্থ নিয়ে আসবেন না প্লিজ। আমরা দেশের জন্য এসেছি, এক হয়েছি। অন্য কিছুর জন্য নয়। আমাদের উদ্দেশ্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা। পার্টির রেষারেষি করতে আমরা আসি নি। যদি এরকম কিছু দেখেন, তাদের বোঝান।            উগ্রতার পথ কখনোই ধরবেন না। আমরা অন্যায়ের বিচারের জন্য এসেছি, নিজেরা অন্যায় করতে নয়। আর ন্যায় তখনি হবে যখন আমি-আমরা ন্যায়ের পথ বাছবো। ভুল হয়ে গেলে স্বীকার করবো, ক্ষমা চাইবো, প্রয়োজনে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করবো। কিন্তু মিথ্যে বা অন্যায়ের রাস্তা কখনই ধরবো না।

2. কাদের মোল্লা, নিযামী সহ সমস্ত রাজাকার এবং যুদ্ধাপরাধিদের বিচার নিয়ে আন্দোলন করুন। প্রত্যেকের ফাঁসি দাবি করুন। জামাত-শিবিরের বলেই ওদের বিচার হবে আর বি এন পি বা আওয়ামীপন্থি বলে অন্যদের বিচার হবে না ব্যাপারটা ঠিক নয়। দেশের শীর্ষস্থানীয় ও সমস্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য এক হোন। যদি ন্যায়বিচার চান, তবে তা সবার জন্যই কি বাঞ্ছনীয় নয়?

আর দু’দিন পরপর নিশ্চয়ই আমরা এক ইস্যুতে জড়ো হবো না। স্বাধীনতার ৪০ বছর পেরিয়ে গেছে। এখনো আমরা যুদ্ধাপরাধিদের বিচারই করতে পারলাম না। কবে আরো সব হীনতা-দীনতা পায়ে দলে এগুবো? জাতির প্রজন্ম যখন জেগেছে, আসুন সমস্বরে গর্জে উঠি- সমস্ত রাজাকার এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে। সরকারকে অবশ্যই শুনতে হবে। সরকার জনগণের প্রতি অন্যায়ের বিচারই যদি না করলো তবে এ সরকারের মানে কি? আসুন, সমস্ত রাজাকারদের লিস্ট করি। শুরু হোক, কাদের মোল্লা আর নিযামী দিয়েই। কিন্তু সমস্ত রাজাকারের বিচার হওয়া চাই এ দফায়ই। পালে হাওয়া থাকতেই চলুন না এগিয়ে যাই।
3. সমসাময়িক প্রপাগান্ডার সাথে সাথে আন্দোলনের রোখ বদলাতে দেবেন না। আমি রাজীব হত্যারও বিচার চাই আমাদের দাবীর সাথে সাথে। কোন ধর্ম, আবেগ বা রাজনৈতিক কারণই আমাদের হত্যা করার অধিকার দেয় না। আর ইসলাম তো নয় ই। আমি এই কথা বলতে পারি এ কারণে যে আমি আমার ধর্ম জানি। আমি পড়ি এবং জানার চেষ্টা করি। এই হত্যাকান্ড যেই ঘটাক না কেন, তার শাস্তি কামনা করি। No murder is justified (except for jurisdiction of crimes).

কিন্তু তাই বলে এর সাথে আস্তিকতা-নাস্তিকতা মিলিয়ে আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত করে রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে দেবেন না। কাউকে না। না আওয়ামী, না বি এন পি, না জামাত-শিবির, না আর কারো অধিকার আছে আমাদের অনুভূতি নিয়ে খেলা করার। না তাদের অধিকার আছে আমাদের বিশ্বাসে কুঠারাঘাত করার। আমি জানি না যেই ব্লগ রাজীবের বলে ছড়ানো হচ্ছে তা রাজীবের কিনা আদৌ। রাজনৈতিক মোটিভ থেকে হতে পারে বা নাও পারে। শুধু এটুকু জানি, যে-ই লেখুক খুবই নীচ একটি কাজ করেছেন। যেখানে স্বয়ং বিশ্ব ইতিহাস স্বাক্ষী মুহাম্মাদ (সাঃ) বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, সেখানে তাকে নিয়ে এরকম বাজে লেখা খুবই হীনতার পরিচয়। আর কিছু না হোক দেশের সিংহভাগ মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করার কারোর ই নেই। আর তার বিচার রইলো স্বয়ং আল্লাহের কাছে। ঊনার রসুল, ঊনি বুঝবেন। আমি আন্তরিক ঘৃণা প্রকাশ করছি এই কাজের।

যারা উগ্রপন্থী তাদের বলি, এখনো সময় আছে, পড়ুন… জানুন। আল্লাহ তা’আলা তার নবীকে (সাঃ) জগতের রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। হত্যা-অনাচার আর ব্যাভিচারসহ সমস্ত অন্যায় দূর করার জন্য। আর অন্যায় শুধুমাত্র ন্যায় দিয়েই বদলানো যেতে পারে। যেমন অন্ধকার থেকে মুক্তির জন্য আলোর বিকল্প নেই, ঠিক তেমনি ইসলাম বা শান্তির জন্য সহনশীলতার বিকল্প নেই। তসলিমা বা এরকম অন্যান্য যারা লিখেন, তাদের লিখতে দিন। ওদের কাজের বিচার আল্লাহ করবেন।

আওয়ামি উগ্রপন্থীদের বলছি, আপনারা মেরে-কেটে কোন আদর্শ ভেস্তে দিতে পারবেন না। হোক সেটা ভুল। আপনারা যখন জোর করবেন, মারবেন- মানুষের মধ্যে সহানুভূতি জন্ম নেবে। ভুলটা ও স্বীকৃতি পেয়ে যাবে। এখনকার যে প্রজন্ম শিবির করে, ওরা ভুল পথে গিয়েছে, তাই বলে মেরে ফেলবেন?                                  As I said before, No murder is justified (except for the jurisdiction of crimes). Neither if they kill someone, nor if you kill someone. Killing is killing after all.

ওদের বোঝান। শেখান। ভালোবাসা দিন, ফিরিয়ে আনুন। যদি অন্যায় করে শাস্তি দিন। কিন্তু মেরে-কেটে আপনারা ভাইরাস দূর করতে পারবেন না। আরো ছড়িয়ে যাবে।

পরিশিষ্ট

আমি রাজনীতির সাথে জড়িত নই। আমি একজন অতি সাধারণ মুসলমান ও মানুষ। আমি জানি আমার বাবা-মা, মামা-খালু দেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন একটা শান্তিপূর্ণ স্বপ্নের দেশের জন্য। তারা আজকের এই দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন অরাজকতার বাংলাদেশ চান নি। সৎ ছিলেন, সারাজীবন ভুগেছেন। কিন্তু অন্যায় করেন নি, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন নি। স্বপ্নচূর্ণের কষ্ট তাদের মাঝে আমি দেখেছি সারা জীবন, কিন্তু স্বপ্ন দেখা ছাড়িনি। কেননা, তারা আমায় শিখিয়েছেন স্বপ্ন দেখা। আমি আজো বিশ্বাস করি আমাদের স্বপ্নের সেই দিন আসবে। তবে তার জন্য আমাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। নিজের চেয়ে অন্যের প্রাধান্য দিতে হবে। যদি আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা ভীত-স্বার্থপর-অন্ধ হতেন, আজ আমরা স্বাধীন হতাম না। তাদের এই বিসর্জনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটিই উপায়। তাদের স্বপ্নভাঙ্গার কষ্টে মলম লাগিয়ে তাদের আত্মার গ্লানি দূর করা। আল্লাহ আমাদের সেই তৌফিক দিন। আমিন।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s